অন্যান্য

সূর্যের রং কোন কোন সময় লাল কেন

আবহমান কাল ধরে এটাই সত্যি। এটাই আমরা জানি যে, সূর্য যখন ওঠে কিংবা অস্ত যায়, তখন কখনও কখনও তার রং হয় লাল। ওই লাল সূর্যের আভায় আকাশেও তখন অপূর্ব রক্তিম বা কমলা রং ধরে, কখনও বা তার মধ্যে বেগুনি আভায় দেখা যায়।

কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না কেন সময়ে সময়ে সূর্য এই লাল রং ধারণ করে।

গোধুলি বেলার এই রংয়ের খেলা নিয়ে কত গান বাধা হয়েছে, কত কবিতা লেখা হয়েছে, এ নিয়ে রোমান্টিকতার শেষ নেই। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে শুদ্ধ ও শুষ্ক বিজ্ঞান।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্প্রতি পৃথিবীর কোন কোন জায়গায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময়টাতে নানা রংএর বিচ্ছুরণ আকাশকে অপূর্ব দৃশ্যময় করে তুলেছে। আকাশে এখন লাল সূর্য আর রং-এর খেলা দেখা যাচ্ছে আগের তুলনায় বেশি।

তাই আবহমান কালের এই রোমান্টিক আলোর জগতের পেছনে বিজ্ঞানের বাস্তবতা কী, সেটাই জেনে নেব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে।

আলোয় ভুবন ভরা

আকাশে এমন অপরূপ দৃশ্যের একটা ব্যাখ্যা হল র‍্যালে স্ক্যাটারিং – পদার্থবিদ র‍্যালের নীতি অনুযায়ী বিচ্ছুরিত আলো ভেঙে ছড়িয়ে পড়া।

“এটা হল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দিয়ে সূর্যের আলো যখন প্রবাহিত হয়, তখন সেটা যেভাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়,” বলছেন গ্রেনিচের রয়াল মিউজিয়ামের জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ব্লুমার।

বিষয়টা বুঝতে গেলে প্রথমে আলোর উপাদানটা জানতে হবে। আমরা চোখে যে আলো দেখি তাতে আমরা জানি সাতটা রং আছে- লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, গাঢ় নীল এবং বেগুনি।

মি. ব্লুমার বলছেন, “সূর্যের রংএর ক্ষেত্রে এই হেরফের ঘটে যখন সূর্যালোক ভেঙে ছড়িয়ে যায়। যখন আলোর কণাগুলো ভাঙে সেগুলো সমানভাবে ভাঙে না – ভাঙে এলোমেলো ভাবে।”

আলোর মধ্যে প্রত্যেকটা রং-এর ওয়েভলেংথ বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা আর সে কারণেই তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী তাদের রং-এর তীব্রতায় কমবেশি হয়।

যেমন বেগুনি রং-এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, আর লালের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। ফলে কোন্ রং কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে প্রবাহিত হচ্ছে তা নির্ধারণ করবে আমরা কীভাবে সেই রংগুলোর বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করব।

এরপর আমাদের আবহাওয়া মণ্ডলের বিষয়টা বুঝতে হবে। যে আবহাওয়ামণ্ডল বা বায়ুমণ্ডলে রয়েছে নানাধরনের গ্যাসের স্তর, যার মধ্যে রয়েছে অক্সিজেনও, যেটাতে আমরা শ্বাস নিই এবং যেটা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য।

আরও পড়ুনঃ বজ্রপাত বাড়ছেই ঝরছে প্রাণ

ছড়িয়ে পড়া বিচ্ছুরিত আলো

সূর্যের আলো যখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন তা বেঁকেচুরে এবং ভেঙে যায়, যেন একটা প্রিজম বা ত্রিভুজাকৃতি স্ফটিকের মধ্যে দিয়ে সেটা যাচ্ছে। এর কারণ বায়ুমণ্ডলে যেসব গ্যাস রয়েছে, তার প্রতিটার ঘনত্ব আলাদা।

এছাড়াও বায়ুমণ্ডলে অন্যান্য যেসব কণা রয়েছে, সেগুলোর কারণে ভেঙে যাওয়া আলোর কণাগুলোর প্রতিফলন তৈরি হয়।

সূর্য যখন অস্ত যায় বা ওঠে, তখন সূর্য রশ্মি আবহাওয়া মণ্ডলের সবচেয়ে উপরের স্তরে একটা বিশেষ কোণ থেকে ধাক্কা মারে এবং সেখান থেকেই শুরু হয় সূর্যের আলোর “ম্যাজিক”।

সূর্যরশ্মি এরপর যখন উপরের স্তর ভেদ করে ভেতরে ঢোকে, তখন সেই স্তর নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শুষে নেয় না, বরং সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে প্রতিফলিত হয়।

“সূর্য যখন দিগন্তের নিচের দিকে অবস্থান করে, তখন নীল আর সবুজ রং ভেঙে যায় এবং আমরা কমলা এবং লাল রং-এর আভা দেখতে পাই,” বলছেন মি. ব্লুমার।

এর কারণ, আলোর যে রংগুলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছোট (যেমন বেগুনি এবং নীল) সেগুলো বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো যেমন কমলা এবং লালের চেয়ে বেশি ভেঙে যায় এবং এর ফলে আকাশে নানা রং-এর আলোর অসাধারণ বিচ্ছুরণ আমরা দেখি।

কিন্তু আকাশ এত লাল দেখায় কেন?

হ্যাঁ, দেখে মনে হতে পারে সূর্যের কিছু পরিবর্তনে এমনটা ঘটছে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। এটা শুধু দেখার রকমফের।

পৃথিবীর কোথায় আপনি আছেন, তার ওপর নির্ভর করবে সূর্যের কী রং আপনি কীভাবে আকাশে দেখবেন। যেখানে আপনি আছেন সেখানে বায়ুস্তরের অবস্থা অনুযায়ী সূর্যের আলো আকাশকে আলোকিত করবে।

“ধূলোর মেঘ, ধোঁয়া এগুলোও আকাশের আলোর বিচ্ছুরণের ওপর প্রভাব ফেলে,” বলছেন মি. ব্লুমার।

আপনি কোথায় আছেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় না বাংলাদেশ বা ভারতে, নাকি চিলে বা অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা আফ্রিকার কোথাও- অথবা লাল বালুর কাছাকাছি এমন কোনখানে- তার ওপর নির্ভর করবে আলোর প্রতিফলন ঘটায় বায়ুমণ্ডলের যেসব কণা সেগুলো আপনার বায়ুমণ্ডলে কী পরিমাণে এবং কতটা সক্রিয় অবস্থায় আছে, আর পাশাপাশি আপনি যেখানে আছেন সেখানে আবহাওয়ার পরিস্থিতি কী। আর সেটার ওপরই নির্ভর করবে আকাশ আপনি কীভাবে দেখছেন।

“এটা কিছুটা হয় মঙ্গল গ্রহের মত। যখন লাল ধূলিকণা বাতাসে বেশি থাকে, তখন মনে হয় আকাশের রং গাঢ় গোলাপী,” মি. ব্লুমার ব্যাখ্যা করেছেন।

আপনি এমনকী যদি মরুভূমি থেকে অনেক দূরেও থাকেন, তাহলেও আকাশের এই নাটকীয় রং আপনি দেখতে পাবেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায়ই সাহারা মরুভূমির বালুকণা আবহাওয়া মণ্ডলের উপরদিকের স্তরে উঠে সেখানে অবস্থান করে। সেখান থেকে ওই বালুকণার স্তর ইউরোপ এমনকী সাইবেরিয়া বা আমেরিকা পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারে।

এখন নতুন করে কী ঘটছে?

হয়ত যা ঘটছে, তা আশ্চর্য হবার মত কিছু নয়। কিন্তু যেটা বদলেছে সেটা হল আমরা অনেক জিনিস কিছুটা ভিন্নভাবে দেখছি।

“আমরা দেখেছি, লকডাউনের পুরো সময়টাতে মানুষ প্রকৃতির দিকে, আকাশের দিকে বেশি নজর দিয়েছে, কারণ মানুষের করার জিনিস এসময় অনেক কম ছিল,” বলছেন মি. ব্লুমার।

সিনেমা, থিয়েটার, বিনোদনের বেশিরভাগ পথ বন্ধ থাকায় আমরা বাসায় থেকেছি বেশি, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছি বেশি, বলছেন তিনি।

তিনি আরও বলছেন, এছাড়াও আকাশে বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় এবং দূষণের মাত্রা কম থাকায় মানুষ আকাশে তারা দেখার চেষ্টা করেছে বেশি, অর্থাৎ আকাশের দিকে নজর দিয়েছে আগের তুলনায় বেশি।

রংধনুর বৈচিত্র

পদার্থবিজ্ঞানী র‍্যালে আলোকরশ্মির ভেঙে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে যে তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন তাতে দিনের মাঝামাঝি সময়ে আকাশ কেন আরও বেশিনীল দেখায় তাও ব্যাখ্যা করা হয়।

সূর্য যখন আকাশে মাথার ওপরে থাকে, তখন তার রশ্মি আবহাওয়া মণ্ডলের একটা অখণ্ড স্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে প্রভেদ না থাকায় এই আলো ভেঙে যায় না। আবহাওয়া মণ্ডল এই রশ্মিকে শুষে নেয়, ফলে আমরা আলোর যে রং দেখি তা মূলত নীল।

কিন্তু আবহাওয়া মণ্ডলে বদল ঘটলে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।

সূর্য আকাশে থাকা অবস্থায় যদি বৃষ্টি হয়, তখন প্রতিটা বৃষ্টি বিন্দুতে আলোর কণা বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভক্ত হয়ে যায়, এবং ভেঙে যাওয়া আলোর প্রতিটা রং-এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী তার প্রতিসরণ দেখা যায় আবহাওয়া মণ্ডলে।

উনবিংশ শতাব্দীতে পদার্থবিদ লর্ড র‍্যালে সূর্যকিরণ এবং বায়ুমণ্ডল নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আকাশের রং কেন নীল তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন।

Visit Our Facebook Page : Durdurantonews

Follow Our Twitter Account : Durdurantonews

Show More

Durdurantonews.com

It's your trustable source for all the latest happenings. We’re dedicated to providing you the very best of News locally and internationally, with an emphasis on online portal.Founded in [2012] by Rabeya khatun chowdhury, DURDURANTONEWS has come a long way from its beginnings . When Rabeya khatun chowdhury first started out, her passion for delivering the truth to the people drove them to read this news portal.We hope you enjoy our Daily News as much as we enjoy offering them to you. If you have any questions or comments, please don’t hesitate to contact us.Sincerely,Rabeya Khatun Chowdhury.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + seven =

Back to top button
Close