অন্যান্য

পূর্ব জার্মানিতে কমিউনিজমের পতন বদলে দিয়েছে যে নামিবিয় শিশুদের জীবন

১৯৭৯ সালে নামিবিয়া থেকে চারশো শিশুর একটি দল এসে পৌঁছালো সেসময়ের কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানিতে। নামিবিয়ায় তখন স্বাধীনতার জন্য লড়াই চলছে দক্ষিণ আফ্রিকার দখলদারি বাহিনির বিরুদ্ধে। আর এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকা পিপলস অর্গানাইজেশন বা সোয়াপো।

সেই যুদ্ধ থেকে বাঁচাতেই চারশো নামিবিয় শিশুর এই দলকে আনা হয়েছিল পূর্ব জার্মানিতে। পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে সংহতি গড়ে তোলার যে চেষ্টা তখন চলছিল, মূলত সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।

পূর্ব জার্মানিতে আসা এই দলে ছিলেন জেমা কামাটি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র চার বছর। জেমা এবং তার মত আরও অনেক নামিবিয় শিশুর জীবন কিভাবে পাল্টে গিয়েছিল এই ঘটনার জের ধরে, তা জানার চেষ্টা করেছেন বিবিসির ইয়োহানেস ডেল।

জেমা কামাটির মনে আছে, ১৯৭৯ সালে যখন তাদের পূর্ব জার্মানিতে নিয়ে আসা হয়, তখন শীতকাল, চারিদিকে তুষারে ঢাকা।

“জার্মানিতে প্রথম দেখায় যে বিষয়টা আমার মনে সবচেয়ে বেশি ছাপ ফেলেছিল, সেটা হচ্ছে তুষারপাত। একটা বড় বাড়ি। তারপর এই তুষারপাত। রূপকথার গল্পে যেরকম শীতের বর্ণনা থাকে, একদম সেরকম। আর আমাদের প্রথম সত্যিকারের অভিজ্ঞতা ছিল ক্রিসমাস। এক ফাদার ক্রিসমাস আমাদের জন্য উপহার নিয়ে আসলেন। তখন কিছু শিশু কেঁদে ফেললো। কারণ লোকটা একটা মুখোশ পরে ছিল। কিন্তু তারপরও লোকটির হাত থেকে আমরা উপহার নিয়েছিলাম।”

জেমা কামাটি পূর্ব জার্মানিতে এসে পৌঁছান ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে। তার বয়সী এক ছোট্ট শিশুর জন্য এটি ছিল একেবারেই ভিন্ন এক জগত। তখনো পর্যন্ত আফ্রিকার বাইরের জীবন তার এবং তার পরিবারের কাছে একেবারে অচেনা।

“আমার সবচেয়ে পছন্দ ছিল পার্ক। সেখানে ছিল একটা দুর্গ। আর চারপাশে খুবই সুন্দর একটা পার্ক। আমার মনে আছে, শুরুতে আমরা সবসময় সেই পার্কে একটা কুঁড়েঘর বানাতাম, এটা হয়তো আমাদের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে। আমরা সবসময় একজন আরেকজনকে বলতাম, আগে আমাদেরকে একটা কুঁড়েঘর বানাতে হবে, নইলে কিন্তু আমাদের থাকার মতো কোন বাড়ি থাকবে না।”

নামিবিয়া যখন দক্ষিণ আফ্রিকার কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য লড়াই তীব্রতর করেছে, তখন এসব শিশুকে নিরাপত্তার জন্য সরিয়ে আনা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার বাহিনী একটি শরণার্থী শিবিরে বোমা ফেললো। এই শিবিরটি পরিচালনা করতো সাউথ ওয়েস্ট আফ্রিকান পিপলস অর্গানাইজেশন বা সোয়াপো। বোমা বর্ষণে সেখানে শত শত মানুষ মারা যায়, তার মধ্যে ছিল অনেক নারী এবং শিশু। এরপর সোয়াপো পূর্ব জার্মানিকে অনুরোধ জানায়, যেসব শিশুর বাবা-মা নিহত হয়েছে, বা আহত হয়েছে, তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার জন্য।

জেমা কামাটিকে তখন নির্বাচন করা হয়, কারণ এই লড়াইয়ে তার বাবা একটি পা হারিয়েছিল। পূর্ব জার্মানিতে এসব শিশুকে একটি পুরনো হান্টিং ক্যাসেলে রাখা হয়। বার্লিনের প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তরে একটা এলাকায় এই ক্যাসেল। সেখানে শিশুদের যত্ন করার জন্য জার্মান সেবাকর্মী ছাড়াও ছিল কিছু নামিবিয় শিক্ষক।

জেমা বলেন, তারা যেন তাদের দেশে যে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছে, সে সম্পর্কে জানতে পারেন, এবং যাতে তারা তাদের নামিবিয় ঐতিহ্য ভুলে না যান, সেটা দেখা ছিল এই শিক্ষকদের দায়িত্ব।

“প্রথমে আমরা শিখেছিলাম আমাদের দেখাশোনা করতো যে নামিবিয়রা, তাদের ভাষা, অশিবাম্বো। কিন্তু যত সময় যেতে লাগলো, আমরা আরও বেশি বেশি জার্মান শিখতে শুরু করলাম। এরপর কিন্তু আমরা এই দুই ভাষা মিলিয়ে নিজেদের একটা ভাষা তৈরি করলাম। পরে এই ভাষাটার নাম দেয়া হলো অশি-ডয়েচ। আমরা কিন্তু এখনো একে অন্যের সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলি।”

১৯৮৫ সালে এই শিশুদের জীবনে একটা বড় পরিবর্তন আসলো। বয়সে বড় শিশুদের তখন নিয়ে যাওয়া হলো স্টাশফোর্ডের স্কুল অব ফ্রেন্ডশিপে। এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল পূর্ব জার্মানির উন্নয়ন সাহায্য কর্মসূচীর অংশ। এর আগে এই স্কুলে মোজাম্বিকের কয়েকশ শিশু পড়াশোনা করেছে।

আরও পড়ুনঃ করোনা সংশ্লিষ্ট বিরল ও বিপদজনক উপসর্গে আক্রান্ত বিশ্বের বেশ কিছু শিশু

“শুরুতে কিন্তু আমরা বেশ গর্বই অনুভব করছিলাম। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল আমরা যেহেতু বড় হয়েছি, তাই আমাদের বড় শহরে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর আগে আমাদের মধ্যে যে নিরাপত্তার বোধটা ছিল, সেটা যেন চলে গেল।”

তবে জেমা এবং তার বন্ধুদের সবসময় মনে করিয়ে দেয়া হতো, তাদের তৈরি করা হচ্ছে তাদের দেশের নেতৃত্ব দেয়ার জন্য।

“সেখানে আমরা যখন সময় কাটাচ্ছি, তখন আমাদের বার বার কিন্তু বলা হয়েছে, আমরা ফিরে যাবো। ফিরে যাওয়ার মানে হচ্ছে, আমরা নামিবিয়ায় ফিরে গিয়ে দেশটাকে নতুন করে গড়ে তুলবো। আমরাই হবো সেই পুনর্নির্মাণের কারিগর। কাজেই আমাদের শিখতে হবে। কারণ অন্যরা এই শেখার সুযোগ পায়নি। কাজেই সেখানে আমরা যে সময়টা কাটিয়েছি, সেখানে এই নৈতিক ব্যাপারটা সবসময় ছিল।”

নামিবিয়ার এই শিশুদের নিজেদের একটি ইয়ুথ গ্রুপ ছিল। পূর্ব জার্মানিতে তখন তরুণদের যেরকম সোশ্যালিস্ট ইয়ুথ গ্রুপ ছিল, একেবারে হুবহু সেটার আদলে। পূর্ব জার্মান ইয়ুথ গ্রুপের সদস্যদের ছিল নীল স্কার্ফ, আর নামিবিয় শিশুদের ছিল সোয়াপোর পতাকার রঙে।

কিন্তু জেমা কামাটি পূর্ব জার্মানিতে আসার পর দশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যেই সেখানে কমিউনিজমের পতন ঘটতে শুরু করলো। এই কিশোর-কিশোরীরা তখন বুঝতে পারলো, তারা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। জেমা বুঝতে পারছিলেন, বড় কোন একটা পরিবর্তন আসন্ন।

“হঠাৎ করে যেন দোকানপাটে নতুন সব ম্যাগাজিন দেখা যেতে শুরু করলো। পশ্চিম জার্মানি থেকে আসা জিনিসপত্রে দোকানপাট ভরে গেল। আশির দশকে খুব ঝলমলে সব রঙের প্রচলন ছিল। গোলাপি, ফিরোজা- এরকম সব রঙ। বেশ জাঁকালো সব রঙ। হঠাৎ করে এই যে ভোগ্যপণ্যের প্রাচুর্য, এটাই আমরা বেশি লক্ষ্য করেছিলাম।”

এত সব অনিশ্চয়তার মধ্যে হঠাৎ একদিন খবর আসলো, এই দলটিকে নামিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হবে। তাদেরকে মাত্র এক সপ্তাহ সময় দেয়া হলো, এই বিষয়টা মেনে নেয়ার জন্য, যেটি কিনা আবার তাদের জীবনে উলটপালট ঘটিয়ে দেবে। ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন জেমা।

“আমরা যখন আমাদের সুটকেস গোছাতে শুরু করলাম, তখনই আসলে আমরা প্রথম বিষয়টা পুরোপুরি উপলব্ধি করলাম। তার আগে পর্যন্ত আমি ভেবেছিলাম, আমি হয়তো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখছি। আমাদের ওরা নিশ্চয়ই ফেরত পাঠাতে পারে না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, অনেক ছেলে-মেয়ে জানতোই না, তাদের কোথায় পাঠানো হচ্ছে, কোথায় তাদের ঠাঁই হবে। কাজেই এই ফিরে যাওয়ার অনুভূতিটা ছিল খুবই বিমূর্ত। ফিরে যাওয়ার অর্থ আসলে কী, আমি জানতাম না। আমার নতুন বাড়ি কোথায় হবে। খুব অল্প সময়ের নোটিসে সব ঘটছিল। খুব তাড়াতাড়ি।”

কাজেই পূর্ব জার্মানিতে আসার ১১ বছর পর, নামিবিয়ার এই টিনএজাররা এমন এক দেশ ছেড়ে গেল, যে দেশটির আর কোন অস্তিত্ব নেই। আর এমন এক দেশে তারা রওনা হলো, যে দেশটি মাত্র স্বাধীন হয়েছে। নামিবিয়ায় ফিরে আসলেন জেমা কামাটি।

“নামিবিয়া দেখে প্রথম আমার যে কথাটি মনে হয়েছিল, সবকিছু কী ভীষণ শুষ্ক। বিমানবন্দর থেকে আমাদের একটা জায়গায় আনা হয়েছিল, একটা কিন্ডারগার্টেন, যেখান থেকে আমাদের আত্মীয়-স্বজন আমাদের সংগ্রহ করবে।”

“আমার বাবা তিন মাস পর এসেছিল আমাকে নিয়ে যেতে। আমি তাকে ছবি দেখে চিনতাম। তাকে দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই আমার বাবা। তবে আমাদের এই সাক্ষাৎ সেরকম আবেগময় ছিল না। আমরা যে পরস্পরকে চিনি, সেরকম কোন ব্যাপার সেখানে ছিল না। বাবা আমাকে কেটাটুরা শহরে নিয়ে গেলেন। সেখানে আমরা একসঙ্গে বসলাম। বাবা একটু সময়ের জন্য বাইরে গেলেন। ফিরে এসে বাবা আমাকে বললেন, সেলমা, জার্মানরা তোমার জন্য একটা সমাধান খুঁজে বের করবে। বাবা ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিলেন। এরপর উনি আমাকে সেই হোস্টেলে ফিরিয়ে নিয়ে আসলেন, যেখানে আমরা থাকতাম, আমার বিশ্বাস, তিনি নিজেও জানতেন, তিনি আমার দেখাশোনা করতে পারবেন না। কিন্তু তখন আমার একটা দক্ষতা অন্তত ছিল। আমি জার্মান বলতে পারতাম। এই ভাষার জোরে আমি হয়তো কিছু একটা করতে পারবো।”

জেমা কামাটির এক চাচা তাকে নামিবিয়ার এক জার্মান স্কুলে ঢুকিয়ে দিলেন। সেখান জেমা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং তার পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। কিন্তু দুবছর পর তার পালক বাবা-মাও যখন জার্মানিতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো, তখন তারা জেমাকে সাথে নেয়ার প্রস্তাব দিল। এটা ছিল জেমার জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত।

“আমরা জার্মানিতে যাওয়ার আগে আমার পরিবারকে দেখতে গেলাম, ক্রিসমাসের আগে প্রথমবারের মতো। আমি আমার মায়ের সঙ্গে বেশ ভালোই মানিয়ে নিয়েছিলাম, কাজেই এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি একই সঙ্গে এটাও দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার জীবনটা কতটা আলাদা হতে পারতো, যদি আমি পূর্ব জার্মানিতে না যেতাম। তখন আমি বুঝতে পারিনি, এই বিদায় আসলে চিরতরে বিদায়, যদি আমি জানতাম, আমার মায়ের সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না, হয়তো আমি ভিন্ন কোন সিদ্ধান্ত নিতাম। আর যেহেতু আমি কখনোই আমার পরিবারের সঙ্গে থাকিনি, আমি তাদের কাছ থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। এর জন্য আমি আসলেই দুঃখিত। আমি এই দুই ধারার জীবনকে এক করতে পারিনি।”

পূর্ব জার্মানিতে যাওয়া নামিবিয়ার এই ছেলে-মেয়েদের জীবন নানা দিকে বাঁক নিয়েছে। কারও কারও জীবনের সামনে নতুন সুযোগ খুলে গেছে। কারও কারও জীবন হারিয়ে গেছে। এরা কী কারণে জার্মানিতে এসেছিল, সেটা হয়তো পরিষ্কার, কিন্তু কেন তাদের জীবন নিয়ে এত সংশয় তৈরি হলো, সেটা বোঝা কঠিন।

এই সংশয় আর বিভ্রান্তির মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন জেমা।

“জার্মানির ক্ষেত্রে যেটা হয়েছিল, দুই জার্মানি এক হওয়ার পর যে বিশৃঙ্খলা চলছিল, তখন আমাদেরকে এক পাশে ঠেলে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আর নামিবিয়ার ক্ষেত্রে যেটা ঘটছিল, যেসব আদর্শ তখন সামনে ছিল, আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতাম, দলও এই আদর্শ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর দেখা গেল, সোয়াপো একদম ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। কাজেই আমার কাছে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাল। আমাদের শেখানো হয়েছে, জীবন খুবই রাজনৈতিক। স্কুলে আমাদের অনেক শিক্ষক ছিল, যারা তাদের মধ্য বয়সে, এরা এই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করতো, এরপর তারা তাদের কাজ হারালো। তখন আমার মনে হয়েছিল আমাদের ফেলে দেয়া হয়েছে, কিন্তু তারপরও নিজের জীবনকে নিজের হাতে নেয়ার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। আমি সৌভাগ্যবান, এই অর্থে যে, আমি তখনো আমার জীবন যাপন করিনি।”

জেমা কামাটি এখনো জার্মানিতে থাকেন এবং ইতিহাস এবং দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন। নিজের পরিবারকে দেখতে তিনি যখনই সম্ভব নামিবিয়ায় যান।

Visit Our Facebook Page : Durdurantonews

Follow Our Twitter Account : Durdurantonews

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − eleven =

Back to top button
Close