অন্যান্য

গাত্রবর্ণ নিয়ে নিজ জাতির কাছেই যারা বৈষম্যের শিকার

গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্য মোটামুটি সব সমাজেই আছে।

একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যাদের গায়ের রঙ একটু ফর্সা বা হালকা তারা একটু বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় সব সমাজে এর মারাত্মক প্রভাব থাকলেও এনিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়।

হার্ষারিন কাউর বেড়ে উঠেছেন নিউজিল্যান্ডে। বড় হয়ে প্রথমবারের মতো তার পূর্ব পুরুষের দেশ ভারতে বেড়াতে গিয়ে একটা জিনিস দেখে তিনি খুবই অবাক হন। আর সেটা হলো গায়ের রঙ পরিবর্তন করার ব্যাপারে সামাজিক চাপ।

চারপাশে সিনেমার যেসব বিলবোর্ড লাগানো সেসব দেখে মনে হয় যাদের গায়ের রঙ ফর্সা বা হালকা শুধু সেসব নারী পুরুষরাই যেন এই শিল্পে সফল হতে পেরেছে।

টেলিভিশনেও ত্বকের যত্ন নেওয়ার যেসব সামগ্রীর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় সেগুলোতে জোর দিয়ে বলা হয় যেসব নারীর গায়ের রঙ ফর্সা তারা চাকরি, স্বামী ও সুখ খুঁজে পায়।

“নিউজিল্যান্ডে আমি কখনো গার্নিয়ে কিম্বা ল’রিয়াল কোম্পানিকে কখনো তাদের পণ্যের প্রচারণা চালাতে দেখিনি। কিন্তু ভারতে এনিয়ে সবখানেই বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে,” বলেন কাউর, যিনি ইন্সটাগ্রামে দ্য ইন্ডিয়ান ফেমিনিস্ট নামে জনপ্রিয় একটি পাতা পরিচালনা করেন।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে ল’রিয়াল কোম্পানি ২০২০ সালের জুন মাসে ঘোষণা করে যে তারা ত্বক সংক্রান্ত তাদের সকল পণ্য থেকে “শাদা”, “ফর্সা” এবং “হালকা” এই শব্দগুলো তুলে নেবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গায়ের রঙ ফর্সা করার কথা বলে এসব পণ্যের বড় আকারের বাজার গড়ে উঠেছে।

এসব দেশের মানুষের গায়ের রঙ সাধারণত একটু কালো হয়। বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা পেতে গায়ের এই রঙ প্রয়োজনীয়।

বৈষম্য ও কালারিজম

একই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যাদের গায়ের রঙ ফর্সা বা হালকা তাদের সঙ্গে বাকিদের যে বৈষম্য তাকে বলা হয় কালারিজম।

কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়। তবে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে এটা নিয়ে তেমন কথাবার্তা হয় না, যদিও এসব দেশে গায়ের রঙ নিয়ে অনেকে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে থাকে।

তবে ২০২০ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ এবং বর্ণবাদ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজেও লোকজন গায়ের রঙ সংক্রান্ত বৈষম্য বা কালারিজম নিয়ে আলোচনা করছে।

নেটফ্লিক্সের নতুন একটি রিয়েলিটি সিরিজ ‘ইন্ডিয়ান ম্যাচ-মেকিং’ নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে যেখানে কাঙ্ক্ষিত পাত্র পাত্রী খুঁজতে গিয়ে ফর্সা পাত্রপাত্রীকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

এসব প্রতিবাদের মুখে লোকজন এখন এধরনের পণ্যের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে আরো বেশি সোচ্চার হয়েছে।

‘ফেয়ার এন্ড লাভলি’

কোন কোন কোম্পানি এসব প্রতিবাদে সাড়া দিয়েছে। ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্র্যান্ডের মালিক কোম্পানি ইউনিলিভার ঘোষণা করেছে ত্বক সংক্রান্ত তাদের যেসব পণ্য আছে সেগুলো থেকে “সুন্দর”, “ফর্সাকারী” এবং “রঙ হালকা করে” এধরনের কথা সরিয়ে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ফেয়ার এন্ড লাভলির নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেওয়া হবে গ্লো এন্ড লাভলি।

কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলছেন, ব্রান্ডের নাম পরিবর্তনের জন্য যা যা করা দরকার সেগুলো ইতোমধ্যেই করা হচ্ছিল কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর কারণে এই প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হয়েছে।

এর মধ্যে ফেয়ার এন্ড লাভলির পণ্য দোকানের শেল্ফ থেকে সরিয়ে নেয়ারও আবেদন জানিয়েছে অনেকে। এই মর্মে একটি পিটিশনও শুরু হয়েছে।

এধরনের পণ্য বিক্রি অব্যাহত রেখে বর্ণবাদের সমালোচনা করায় ইউনিলিভারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যালেন জোপেরও নিন্দা জানানো হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়।

উল্লেখ্য যে ইউনিলিভার তাদের পণ্য বিক্রি করে বছরে আড়াইশো মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে থাকে।

একই সাথে ফেয়ার এন্ড লাভলির নাম পরিবর্তন করে গ্লো এন্ড লাভলি করার সিদ্ধান্তে ইউনিলিভারের প্রশংসাও করছে কেউ কেউ। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নাম পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়। কারণ এই পণ্যগুলো এখনও বাজারে রয়ে গেছে।

আরও পড়ুনঃ করোনা সংশ্লিষ্ট বিরল ও বিপদজনক উপসর্গে আক্রান্ত বিশ্বের বেশ কিছু শিশু

নতুন নামেরও সমালোচনা

“আমি জানি না এটি ভিন্ন কিছু কিনা। আমি তাদের প্রশংসা করি কারণ তারা নাম বদল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্ভবত এটিই সবচেয়ে পরিচিত ব্র্যান্ড। তবে আমি নতুন নাম গ্লো এন্ড লাভলি দেখে হতাশ হয়েছি। কারণ গ্লো হচ্ছে ফর্সাকারীর মতোই আরেকটি শব্দ,” বলেন নিক্কি খান্না, ভারমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক, যিনি গায়ের রঙ এর কারণে বৈষম্য নিয়ে ২০ বছর ধরে গবেষণা করছেন।

“গ্লো শব্দটি বলতে যা বোঝায় এবং বছরের পর বছর ধরে তারা যেসব বিজ্ঞাপন প্রচার করেছে তার অর্থ একই। এতে রঙ ফর্সা করাকেই বোঝানো হচ্ছে। আমি আশা করবো তারা এতে পরিবর্তন আনবে। এই পরিবর্তন মানে এসব পণ্য পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা।”

কালারিজমের পরিণতি

এবিষয়ে যদিও খুব বেশি গবেষণা হয়নি, তার পরেও কয়েকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে কালারিজমের ফলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে এশীয়-আমেরিকান নারীদের বিষণ্ণতার সাথে গায়ের রঙ কালো হওয়ার কুসংস্কারের সম্পর্ক রয়েছে।

“ইতিহাসে দেখা যায় যে অনেক সমাজেই গায়ের রঙ কালো হওয়াকে খারাপ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ধরে নেওয়া হয় যে তারা ‘নোংরা’ এবং ‘কম শিক্ষিত।’ সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই ধারণাই চলে এসেছে,” বলেন এলিজিয়া ট্র্যান, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

“দক্ষিণ এশীয় সমাজে এরকম বহু বছর ধরেই চলে আসছে। সেখানে জাতপাতের সাথে সামাজিক অবস্থানের একটা সম্পর্ক রয়েছে।”

ভারতীয় বিয়ে শাদি

ভারতীয় সমাজে গায়ের রঙ নিয়ে এই বৈষম্য অনেক বেশি প্রকাশ পায় বিয়ে শাদির ঘটনায়। এসময় সাধারণত মুরুব্বিরা গায়ের রঙ-এর বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সাধারণত পিতামাতারা তাদের সন্তানদের বিয়ে ঠিক করেন। সম্ভাব্য পাত্র পাত্রী ও তাদের পরিবার দেখেই তারা বর ও কণে পছন্দ করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অনুমতির পরেই বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তবে সময়ের সাথে সাথে এখন তরুণ তরুণীদের নিজেদের পছন্দে জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে, যাকে বলা হয় লাভ ম্যারেজ বা প্রেম করে বিয়ে।

কখনও কখনও এনিয়ে পরিবারের সঙ্গে তাদের বিরোধের ঘটনাও ঘটে।

ভারতে পারিবারিক-ভাবে যেসব বিয়ে হয় তার ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে যে হবু শাশুড়িরা যেসব মেয়ের গায়ের রঙ কালো তাদেরকে পুত্রবধূ হিসেবে গ্রহণ করতে চান না। ঘরে তোলার জন্য তারা ফর্সা রঙের মেয়েদেরকেই প্রাধান্য দেন।

পারিবারিক বিয়ের বিজ্ঞাপন

গবেষণার এসব ফলাফলে বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নেই।

পরিবারের উদ্যোগে যেসব বিয়ে হয় এবং তার জন্য পত্রিকায় দেওয়া ‘পাত্র চাই’ ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের মধ্যেও সেটা পরিষ্কার। সেখানে দশকের পর দশক ধরে ফর্সা মেয়েদেরকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

পাত্রীর পরিবার থেকে দেওয়া বিজ্ঞাপনেও মেয়ের রঙ যে ফর্সা সেটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

পাত্র পাত্রী সন্ধান করার যেসব ওয়েবসাইট আছে সেখানেও ত্বকের রঙ এর কথা উল্লেখ করে ফিল্টার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখানে জানতে চাওয়া হয় আপনি ‘ফর্সা’, ‘গমের মতো’ নাকি ‘শ্যামলা’ কোন ধরনের পাত্রী চান। এসব সিলেক্ট করে করে আপনি আপনার পছন্দের মতো জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারেন।

স্কিন ফিল্টার

“পত্র পত্রিকার বিজ্ঞাপনে গায়ের রঙ এর কথা উল্লেখ করা হতো পাত্র-পাত্রী বাছাইর এর ক্ষেত্রে ফিল্টারিং এর জন্য। তাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মানুষের মতো কোম্পানিরও পরিবর্তন ঘটেছে। চার থেকে পাঁচ বছর আগে আমরা এই স্কিন ফিল্টার পরিহারের সিদ্ধান্ত নেই,” বলেন আধিশ জাভেরি, শাদিডটকমের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক।

কিন্তু স্কিন ফিল্টারের এই ছায়া ওয়েবসাইটে রয়ে গেছে: ব্যবহারকারীরা সেখানে গিয়ে পাত্র পাত্রীর স্কিন টোন বা গায়ের রঙ সিলেক্ট করতে পারেন।

এই খবরটি যখন উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় নারীদের একটি ফেসবুক গ্রুপের কাছে গিয়ে পৌঁছালো তারা বিষয়টি শাদিডটকমের নজরে আনার জন্য সাথে সাথেই এর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে শুরু করে দিল।

“২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা দেড় হাজার স্বাক্ষর পেয়ে গেলাম,” বলেন হেতাল লাখানি, টেক্সাসে ডালাসের একজন বাসিন্দা যিনি এই পিটিশন শুরু করেছিলেন।

“এর পর শাদিডটকম ফিল্টারটি উঠিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।”

সাংস্কৃতিক পরিবর্তন

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অতীতে গায়ের রঙ নিয়ে বৈষম্য বা কালারিজমের বিষয়ে খুব একটা নজর দেওয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমানে সোশাল মিডিয়া ও ইন্টারনেটের কারণে এই মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটছে।

এবিষয়ে একটি বই লিখেছেন ভারতীয়-আমেরিকান নারী নিক্কি খান্না: এশিয়ান আমেরিকান উইমেন অন স্কিন কালার এন্ড কালারিজম। তাতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন নারীর এসংক্রান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেছেন, “কালারিজমের মতো বিষয়ের ওপর আলোচনা আজকের ডিজিটাল জগতে কীভাবে বদলে যাচ্ছে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই বই।”

সোশাল মিডিয়ায় প্রচারণা

নিক্কি খান্না এই প্রকল্পটি শুরু করেছিলেন ২০১৭ সালে ফেসবুকে এসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করার আহবান জানিয়ে।

তিনি বলেন, “সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমি আমি আমার নিজের নেটওয়ার্কের বাইরের নারীদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি।।”

নিক্কি খান্না জানান, শুরুতে তিনি অবাক হয়েছিলেন কালারিজম যে এশীয় নারীদের জন্য একটি সমস্যা সেবিষয়ে তাদের কোন ধারণা ছিল না।

কিন্তু পরে এই ধারণায় পরিবর্তন ঘটেছে। তাতে বড়ো ধরনের ভূমিকা রেখেছে সোশাল মিডিয়াতে চলা বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা। তার মধ্যে রয়েছে ডার্ক ইজ বিউটিফুল বা কালোই সুন্দর এবং হ্যাশট্যাগ দিয়ে ব্রাউন ইজ বিউটিফুল – এধরনের ক্যাম্পেইন।

সেখানে দক্ষিণ এশীয় নারীরা এবিষয়ে কথা বলার সুযোগ পায় এবং এক পর্যায়ে নিরবতা ভেঙে তারা মুখ খুলতে শুরু করে।

সোশাল মিডিয়া যে শতাব্দী-প্রাচীন এসব বিশ্বাস ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সেবিষয়ে এলিজিয়া ট্র্যানও একমত।

কালারিজমের কথা যারা তুলে ধরছেন তাদের বেশিরভাগই নতুন প্রজন্মের। তারা বুঝতে পারছেন গায়ের রঙ নিয়ে যে বৈষম্য তাতে জেনারেশন গ্যাপের ভূমিকা রয়েছে।

“সামান্য একটু আলোচনা, অল্প কিছু কথাবার্তা- এসব অনেক বড় বিষয়। এসবের মাধ্যমে আমরা সমাজের অনেক কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে পারবো,” বলেন এলিজিয়া ট্র্যান।

Visit Our Facebook Page : Durdurantonews

Follow Our Twitter Account : Durdurantonews

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − five =

Back to top button
Close