জাতীয়

আলুর দাম বাড়ার পেছনে যে কারণগুলো তুলে ধরা হচ্ছে

বাংলাদেশের বাজারে আলুর দাম বেড়েছে হু হু করে এবং দাম বাড়ার কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটের মধ্যে আছেন স্বল্প আয়ের মানুষেরা।

জুলাই মাসে যেখানে কেজি প্রতি ৩০ টাকায় আলু বিক্রি হয়েছিল, সেখানে বাজার ভেদে আলু এখন বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪৫ থেকে ৫৫ টাকায়।

এর আগে কখনও আলুর দাম এতোটা বাড়তে দেখা যায়নি।

কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এই দাম বাড়ার পেছনে মূলত চারটি কারণ তুলে ধরেছেন।

প্রথমত, উত্তরাঞ্চলে টানা চার মাস প্রলম্বিত বন্যার কারণে আলুর পাশাপাশি সবজির আবাদ কম হয়েছে। সেটার চাপ পড়েছে আলুর ওপর।

দ্বিতীয়ত হিমাগারে আলুর মজুদ গত বছরের চাইতে কমে গেছে।

হিমাগার মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কোল্ড স্টোরেজে আলু মজুদ ছিল ৫৫ লাখ টন। এ বছর মজুদ হয়েছে ৪৫ লাখ টন। অর্থাৎ এবার চাহিদার তুলনায় মজুদ ১০ লাখ টন কম।

এর কারণ হিসেবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, গত বছর আলু বাম্পার ফলনের কারণে কৃষকরা ভালো দাম পায়নি, এ কারণে এবারে তারা আলুর আবাদ কম করেছে।

তৃতীয়ত করোনাভাইরাসের সময় বিভিন্ন ত্রাণ কাজে চাল, ডালের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ আলু বিতরণ হয়েছে, এছাড়া বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আলু কিনেছে।

সেটার প্রভাব বাজারে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

চতুর্থত, সরকারের ২০ শতাংশ ভর্তুকির কারণে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রায় ৪০ গুণ বেশি আলু রপ্তানি হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল ৩ লাখ ৩৬ হাজার ডলার মূল্যের আলু। আর চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের আলু।

এ কারণে বিপুল পরিমাণ আলু দেশের বাইরে চলে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  যুক্তরাষ্ট্রে গেল বেক্সিমকোর তৈরি দেড় লাখ পিপিই

এদিকে, বিদ্যুতের দাম কিছুটা বাড়লেও হিমাগারের মালিকরা আলু সংরক্ষণের খরচ আগের মতোই রাখার কথা জানিয়েছে।

এরপরও বাজারে যে দাম রাখা হচ্ছে সেটা অস্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক।

এজন্য তিনি বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করার আশ্বাস দিয়েছেন।

তবে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে ব্যবসায়ীদেরও নৈতিক হতে আহ্বান জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, “চাহিদার তুলনায় যোগান কম হওয়ায় বাজারে দাম বেড়েছে। ২৫-৩০ টাকা বিক্রি করলেও ব্যবসায়ীদের লাভ হবে। তারপরও তারা কেন এতো দামে বিক্রি করছে? ব্যবসায়ীরা যদি মুনাফার স্বার্থ থেকে সরে দাঁড়ায়, তাতে মানুষেরই উপকার হবে।”

বাজারে আলুর দাম লাগাম-হীন বাড়তে থাকায় দুই দিন আগেই দাম বেঁধে দিয়েছিল সরকার।

কৃষি বিপণন অধিদফতর খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ৩০ টাকা, পাইকারিতে ২৫ এবং হিমাগার থেকে ২৩ টাকা দাম নির্ধারণ করে দেয়।

এর চেয়ে বেশি দামে আলু বিক্রি করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও প্রতিটি জেলা প্রশাসককে চিঠি দেয়া হয়।

কিন্তু বাজারে কোথাও এই নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি হয়নি। ছিল না কোন বাজার মনিটরিং।

দাম প্রসঙ্গে আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সরকার আলুর যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে তা অযৌক্তিক।

হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন বলেন, “এখন আলুর কেজিতে খরচ আছে ২৩ টাকা। কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া, লোডিং আনলোডিংয়ের খরচ, ব্যাংক ইন্টারেস্ট, বস্তার দাম, তার মধ্যে এই সিজনে আলু রাইখা দিলে ওজন কইমা যায়। সব মিলিয়ে কস্টিং তো কম না। সরকার যে দাম দিসে এই দামে কিভাবে বিক্রি করবে?”

তবে ব্যবসায়ীদের এমন দাবি মানতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা।

এই দাম বাড়ার পেছনে বাজারে সুশাসনের অভাবকেই সবচেয়ে বড় কারণ বলে তারা মনে করছেন।

মজুতদারদের কারসাজির কারণে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার যাওয়ার পথেই দাম বাড়ছে বলেও জানান সাবেক কৃষি তথ্য সেবার পরিচালক নজরুল ইসলাম।

তার মতে, বাজারে পর্যাপ্ত আলু থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রেখেছে।

এমন অবস্থায় কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বাজার মনিটরিং এর পরামর্শ দেন তিনি।

সেইসঙ্গে আলু উৎপাদনে সরকারের সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রণয়নের ওপরেও তিনি জোর দেন।

এদিকে সব ধরনের শাকসবজির পাশাপাশি যদি আলুর দামও বেড়ে যেতে থাকে, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষেরা পুষ্টিগত সমস্যায় পড়বেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ঢাকার গৃহকর্মী পারুল বেগমের একার আয়ে চলে ছয় সদস্যের পরিবার।

আগে মাসের শেষে টাকা ফুরিয়ে এলে তিন বেলার খাবার আলুর নানা পদের তরকারি বা ভর্তা খেয়ে সেরে নিতেন।

কিন্তু বাজারে এখন অন্যান্য শাকসবজির পাশাপাশি আলুর দামও বেড়ে যাওয়ায় এক প্রকার খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন তিনি।

পারুল বেগম বলেন, “দুই মাস আগেও আলু কিনছি ৩০ টাকা কেজি। এখন ওইটা ৫০ টাকা। আলু তো মনে করেন একটা জিনিষ, তরি-তরকারি না যোগাইতে পারলে আলু ভাজি নাইলে ভর্তা কইরা ভাত খাইতাম পারি। এখন তো তাও পারতাসি না।”

এমন অবস্থায়, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে রপ্তানি বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Visit Our Facebook Page : Durdurantonews

Follow Our Twitter Account : Durdurantonews

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 3 =

Back to top button
Close